কর্মদিবসগুলোর শেষে যে আনন্দ–উচ্ছ্বাসের মধ্য দিয়ে দুবাইয়ে সপ্তাহান্ত শুরু হয়, তেমনটাই হয়েছিল শনিবার সকালে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পাম জুমেইরাহর সৈকতে অবস্থিত ক্লাবগুলো লোকে লোকারণ্য হয়ে ওঠে। সমুদ্রতীরের প্রমোদভ্রমণের পথে দৌড়বিদদের দলগুলোকে সুউচ্চ অট্টালিকাগুলোর নিচে ওয়ার্ম আপ করতে দেখা যায়। সুশৃঙ্খলভাবে দৌড় শুরু করার আগে তাঁরা নিজেদের শরীরচর্চার ভিডিও ধারণ করছিলেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রামে পোস্ট করা ছবিতে শহরটিকে আগের মতোই ছিমছাম দেখাচ্ছিল। নীল আকাশ, শান্ত সমুদ্র আর দুবাইয়ের বিপণিবিতানের ভেতরে ক্রেতাদের চিরচেনা ভিড় ছিল। তবে এসবের আড়ালে ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের পর ওই অঞ্চলের সবচেয়ে বড় সংঘাত ক্রমেই তীব্র হয়ে উঠছিল।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অংশে আকাশপথ বন্ধ করে দেওয়া হয়। তবে তখনো দুবাই সতর্কতার সঙ্গে নিজেদের স্বাভাবিক ছন্দ ধরে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল।
অনেক বছর ধরে দুবাই নিজেকে পুঁজি আর স্থিতিশীলতার এক নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে তুলে ধরেছে। অস্থির একটি অঞ্চলে এটি ছিল শৃঙ্খলা আর স্বাভাবিকভাবে চলার প্রতীক। প্রতিবেশী দেশগুলোর রাজনৈতিক ঝড় থেকে এ শহর ছিল সুরক্ষিত, কিন্তু সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গেই সেই চিত্র বদলে যায়।
সন্ধ্যা নামার কিছুক্ষণ পরই পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর দিকে ধেয়ে আসতে শুরু করে ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র। পরিস্থিতি সামাল দিতে সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, সৌদি আরব ও বাহরাইনের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সক্রিয় হয়ে ওঠে। রাতের অন্ধকার আকাশ চিরে তখন উড়তে দেখা যায় ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংসকারী ‘ইন্টারসেপ্টর’।
অনেক পর্যটক জানিয়েছেন, তাঁরা এ পরিস্থিতির জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলেন না। সেখানে কোনো সতর্কসংকেত বা এয়ার রেইড সাইরেন বাজানো হয়নি। স্থানীয় ফোন নম্বর ব্যবহারকারী বাসিন্দারা সরকারি সতর্কতাবার্তা পেলেও অন্যরা শুরুতে বুঝতে পারেননি আসলে কী ঘটছে।
নাতালিয়া ভেরেমেনকো নামের এক পর্যটক বলেন, ‘প্রথমে আমরা ভেবেছিলাম, আতশবাজি ফুটছে।’ তিনি পাম জুমেইরাহর পাঁচ তারকা রিসোর্ট ‘ফেয়ারমন্ট দ্য পাম’-এর কাছে অবস্থান করছিলেন। ড্রোন হামলায় রিসোর্টটির প্রবেশদ্বারে আগুন ধরে গিয়েছিল।
নাতালিয়া প্রথমে ভেবেছিলেন, এটি হয়তো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা। কয়েক মিনিটের মধ্যেই রাস্তাগুলো আবার লোকে লোকারণ্য হয়ে ওঠে। তিনি বলেন, ‘তারা খুব দ্রুত সবকিছু পরিষ্কার করে ফেলছিল।’
দুবাই মলের বাইরে অবস্থিত বিখ্যাত ঝরনাগুলোর আলোকসজ্জা দেখার জন্য পর্যটকদের চিরচেনা ভিড় জমেছিল। কিন্তু সেই ছুটির মেজাজ বেশি সময় টেকেনি।
রাত বাড়লে দুবাই ও আবুধাবি বিমানবন্দরে আগুনের খবর পাওয়া যায়। ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ পড়ে সেখানে ঘন ধোঁয়ার সৃষ্টি হয়। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানায়, ড্রোন হামলায় ১ জন নিহত ও অন্তত ১২ জন আহত হয়েছেন। রোববার আরও দুজনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে।
দুবাইয়ের জেবেল আলী বন্দর এলাকা থেকেও ঘন ধোঁয়া উঠতে দেখা যায়। জেবেল আলী বিশ্বের ব্যস্ততম বন্দরগুলোর মধ্যে নবম স্থানে রয়েছে, আর মধ্যপ্রাচ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যস্ত বন্দর এটি। সেখানকার একটি বার্থে আগুন ধরে যায়। এমনকি দুবাইয়ের সবচেয়ে পরিচিত স্থাপনা ও পালতোলা নৌকার আদলে তৈরি বুর্জ আল আরবেও ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ পড়ে আগুন লাগে।
ইরান সরাসরি দুবাইয়ের পর্যটনকেন্দ্র ও হোটেলগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে, নাকি শুধু মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে হামলার ঘোষণা বাস্তবায়ন করছিল, বিষয়টি এখনো স্পষ্ট নয়। এসব স্থাপনাই আমিরাতের আয়ের প্রধান উৎস।
সংযুক্ত আরব আমিরাত বছরের পর বছর ধরে ব্যবসাবান্ধব ও নিরাপদ দেশ হিসেবে যে সুনাম গড়ে তুলেছিল, এ হামলায় তাতে বড় ধাক্কা লেগেছে। দুবাইয়ের বাসিন্দাদের বড় অংশই বিদেশি নাগরিক। মূলত নিরাপত্তা আর করছাড়ের সুবিধার আশায় তাঁরা এ শহরে বসবাস করেন। হামলার পর সেই নিরাপত্তাই এখন বড় প্রশ্নের মুখে।
রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দুবাইয়ের পরিস্থিতি বদলে যায়। অনেক বিলাসবহুল হোটেল তাদের অতিথিদের ক্ষতিগ্রস্ত কক্ষ ও বারান্দা থেকে সরিয়ে নেয়। হোটেলের ভূগর্ভে গাড়ি রাখার জায়গা ও সার্ভিস করিডরে নিয়ে যাওয়া হয়। এ দৃশ্যগুলো ইউক্রেনের শহরগুলোর দৃশ্য মনে করিয়ে দেয়।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবির আল খালিদিয়া আবাসিক এলাকার আকাশে
একজন রুশ লাইফস্টাইল ব্লগার হোটেলের ভূগর্ভ থেকে সিল্কের পাজামা পরা নিজের একটি ছবি পোস্ট করেন। ক্যাপশনে তিনি লেখেন, ‘জরুরি অবস্থা, তবে তাতেও থাকুক ফ্যাশনের ছোঁয়া।’
দুবাইয়ে বসবাসরত রুশ নাগরিক ইয়েকাতেরিনা তাঁর অভিজ্ঞতার কথা জানান। তিনি বলেন, মধ্যরাতে ফোনে যখন নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার বার্তা পান, তখন তিনি খুব আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। কার পার্কিংয়ে গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু ভবন ‘বুর্জ খলিফা’য় হামলা হয়েছে। পরে দেখা গেছে, এটি স্রেফ গুজব ছিল। তবে ওই রাতের অনিশ্চয়তা আর আতঙ্ক এই গুজবের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
সকাল হতেই পরিস্থিতি সামাল দিতে কর্তৃপক্ষ দ্রুত পদক্ষেপ নেয়। তারা বাসিন্দা ও পর্যটকদের আশ্বস্ত করে জানায়, পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণে। বিমানে যাতায়াতে যাঁরা সমস্যার মুখে পড়েছেন, তাঁদের টাকা ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, তাদের ভূখণ্ড লক্ষ্য করে ১৩৭টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ২০৯টি ড্রোন ছোড়া হয়েছে। তবে তাদের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এগুলোর বেশির ভাগই মাঝআকাশে ঠেকিয়ে দিয়েছে।
































